ডাক বিভাগের মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অসম প্রতিযোগিতার শঙ্কা

ডাক বিভাগের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘নগদ’ চালু হলে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হবে বলে মনে করছেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা।

একইসঙ্গে এই লেনদেন সেবা অর্থপাচার ও অপরাধমূলক কার্যক্রমে অর্থায়নের ঝুঁকি তৈরি করবে বলেও মনে করেন তারা।

বিকাশ, রকেট, ইউক্যাশসহ বিদ্যমান মোবাইল ব্যাংকিং সেবাগুলোর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি লেনদেন সীমা এবং ব্যালেন্স নিয়ে চালু হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ডিজিটাল অর্থ লেনদেন সেবা ‘নগদ’।

সারাদেশে এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এ সেবা দেওয়া হবে, যেখানে একজন গ্রাহক দিনে ১০ বারে আড়াই লাখ টাকা জমা এবং একই পরিমাণ টাকা উত্তোলন করতে পারবেন।

বর্তমানে বিকাশ, ইউক্যাশ বা রকেটের একজন গ্রাহক দিনে দুই বারে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা উত্তোলন এবং ১৫ হাজার টাকা জমা করতে পারেন।

বিদ্যমান মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তুলনায় জমার ক্ষেত্রে ২৫ গুণ এবং উত্তোলনে ১৭ গুণ বেশি লেনদেনের সুযোগ পাবেন ডাক বিভাগের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকরা।

নতুন সেবা চালুর জন্য এরই মধ্যে এজেন্ট নিয়োগের কাজ শুরু করেছে ডাক বিভাগ।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে লেনদেন সীমা কমিয়ে জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নির্দেশনায় বলা হয়, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস অল্প সময়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে, বিশেষত নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

‘তবে কিছু অসাধু ব্যক্তি এ সেবার অপব্যবহার করছে, যা দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর। এ পরিপ্রেক্ষিতে অপব্যবহার রোধ এবং যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে লেনদেন সীমা কমানো হল,’ বলা হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় ।

বিদ্যমান নিয়মে একটি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে দিনে সর্বোচ্চ দুই বারে ১৫ হাজার এবং মাসে ২০ বারে এক লাখ টাকা ক্যাশ-ইন বা জমা দেওয়া যায়। তবে ডাক বিভাগের সেবার আওতায় একজন গ্রাহক দিনে ১০ বারে আড়াই লাখ টাকা এবং মাসে ৫০ বারে পাঁচ লাখ টাকা ক্যাশ-ইন করতে পারবেন।
এ ছাড়া বিদ্যমান নিয়মে দুই বারে ১০ হাজার এবং মাসে সর্বোচ্চ ১০ বারে ৫০ হাজার টাকা টাকা ক্যাশ-আউট তথা উত্তোলন করা যায়। আর ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি হিসাবে দিনে ১০ হাজার এবং মাসে ২৫ হাজার টাকা স্থানান্তর করা যায়। ডাক বিভাগের সেবা ব্যবহার করে দিনে ৫০ বারে আড়াই লাখ টাকা এবং মাসে ১৫০ বারে পাঁচ লাখ টাকা স্থানান্তর করা যাবে।

চালু হতে যাওয়া লেনদেন সেবা ‘নগদ’ এর কার্যক্রমের সাথে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয় বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগে। এ পর‌্যন্ত ১৮টি ব্যাংককে এ সেবা চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।যথাযথ নিয়ম মেনে আবেদন করলে ব্যাংকগুলোকে এ সেবা চালুর অনুমতি দেওয়া হয়।

ব্যাংকগুলো বিভিন্ন নামে এ সেবা চালু করেছে।

“এই সেবার কার্যক্রমও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী করতে হয়। কিন্তু ডাক বিভাগ যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংকের আওতায় নয়, সেহেতু তাদের ‘নগদ’ সেবার বিষয়ে আমাদের কিছুই করার নেই।”

গত অগাস্ট মাসে ‘নগদ’ সেবা চালুর অনুমোদন চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করে ডাক বিভাগ। আবেদন নাকচ করে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংক।

তবে ডাক বিভাগ পরিচালিত হয় নিজস্ব আইনের (পোস্টাল অ্যাক্ট) আওতায়। যে কারণে তাদের আবেদন নাকচ করা হয়। এরপর নিজেদের মতো করে সেবাটি চালু করতে যাচ্ছে ডাক বিভাগ। এরই মধ্যে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এ সেবা চালুর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মুনাফা ভাগাভাগির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি সারাদেশে এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে সেবা দেবে।

এ বিষয়ে ডাক বিভাগের মহাপরিচালক সুশান্ত কুমার মণ্ডল বলেন, “ডাক বিভাগের কর্যক্রম সম্প্রসারণের অংশ হিসেবেই আমরা এ সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। এটা এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

‘নগদ’ বিকাশ, রকেটের মতোই একটি সেবা। পোস্ট অফিস সকাল ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আবার সরকারি ছুটির দিন বন্ধ থাকে। এ কারণে সার্বক্ষণিক সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে মুনাফা ভাগাভাগির ভিত্তিতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সুশান্ত বলেন, “আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে ‘নগদ’ নামের সেবাটি চালু করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখতিয়ারে না থাকায় অনুমোদন দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন আমরা নিজেরাই সেবাটি চালু করতে চাইছি।”

এ বিষয়ে মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ- এর করপোরেট কমিউনিকেশনস বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক গত আট বছর ধরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে একটা শৃংখলা আনার চেষ্টা করছে।

“সেই পেক্ষাপটে একই ধরনের এজেন্ট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দুই ধরনের ‘লিমিট’ দিয়ে এই সেবাটি চলতে থাকলে এই খাতের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যাবে বলে আমরা মনে করি।”

দেশে বর্তমানে ১৮টি প্রতিষ্ঠান মোবাইলে অর্থ লেনদেন সেবা দিচ্ছে।

সব প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘লিমিট’ একই রেখে একটি প্রতিষ্ঠানকে এমন সুযোগ দিলে এখাতে একটি অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হবে বলে মনে করেন ডালিম।

Be the first to comment

Leave a Reply